সম্পাদকীয়|Editorial
DOI:
https://doi.org/10.58666/iab.v20i79-80.287Abstract
[সম্পাদকীয়]
আলহামদুলিল্লাহ। আল্লাহর অশেষ মেহেরবানীতে ইসলামী আইন ও বিচার জার্নালের ৭৯ ও ৮০ তম যৌথ সংখ্যা প্রকাশিত হলো। এবারের সংখ্যায় মুসলিম সমাজের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ বিষয় সম্পর্কে পাঁচটি প্রবন্ধ প্রকাশিত হয়েছে।
শুরুতেই রয়েছে “খাদ্যে ভেজাল মিশ্রণে ক্রেতার আচরণগত ভূমিকা: ইসলামী দৃষ্টিকোণ” শীর্ষক প্রবন্ধ। এ প্রবন্ধে খাদ্যে ভেজাল এবং এর প্রভাব বিশ্লেষণ করা হয়েছে, যেখানে খাদ্যক্রেতার আচরণকে বিশেষভাবে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। খাদ্যে ভেজাল শুধুমাত্র বিক্রেতাদের একক দোষ নয়; এটি একটি সামগ্রিক সমস্যা, যেখানে ক্রেতা, বিক্রেতা, খাদ্য তদারকি সংস্থা এবং সমাজের অন্যান্য সদস্যদেরও দায়দায়িত্ব রয়েছে। এই প্রবন্ধে বিশেষভাবে দৃষ্টিপাত করা হয়েছে খাদ্যক্রেতার আচরণ, তাদের সচেতনতার অভাব এবং বিভিন্ন মানসিকতার ফলে খাদ্যে ভেজালের পরিস্থিতি তৈরী হয়। গবেষণার ফলাফল অনুযায়ী, খাদ্যক্রেতাদের মধ্যে BSTI লোগো যাচাই, খাদ্যপণ্যের মেয়াদ যাচাই, সর্বোচ্চ খুচরা মূল্য (MRP) এবং ক্রয় রসিদ সংগ্রহে সচেতনতার অভাব লক্ষ্য করা গেছে। ক্রেতারা সাধারণত এগুলোর দিকে মনোযোগ দেন না, যার ফলে বাজারে ভেজাল খাদ্য আগমনের পথ সহজ হয়। পাশাপাশি, ক্রেতাদের মধ্যে একটি প্রবণতা লক্ষ্য করা গেছে যেখানে তারা মূল্যের তুলনায় পণ্যের মানে কম মনোযোগ দেন। ক্রেতা যখন পণ্যটির মানের চেয়ে দাম কমানোর প্রতি বেশি মনোযোগ দেন, তখন বিক্রেতারা তাদের প্রবণতাকে কাজে লাগিয়ে নিম্নমানের পণ্য ধরিয়ে দেয়, যা খাদ্যে ভেজাল মিশ্রণের অন্যতম কারণ। এছাড়াও, খাদ্য সংকটের সময় ক্রেতারা প্রয়োজনের অতিরিক্ত খাদ্য কিনতে হুমড়ি খেয়ে পড়ে, যার ফলে বাজারে খাদ্য পণ্যে ঘাটতি দেখা দেয়, যা ভেজাল খাদ্যের জন্য উপযুক্ত পরিবেশ সৃষ্টি করে। খাদ্য উৎপাদন ও বিক্রয়ের ক্ষেত্রে নিয়ম-নীতি না মেনে চলা এবং জবাবদিহিতা না থাকার ফলে ভেজাল খাদ্যের সঞ্চালন বেড়ে যায়। এ প্রবন্ধে ইসলামী দৃষ্টিকোণ থেকে বিষয়টি বিশ্লেষণ করা হয়েছে, যেখানে ইসলামের মৌলিক নীতি অনুযায়ী ব্যবসা-বাণিজ্যের ক্ষেত্রে সততা, বিশ্বস্ততা এবং অন্যের ক্ষতি না করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এই গবেষণা প্রবন্ধটি খাদ্য বিষয়ক গবেষক, শিক্ষার্থী এবং নীতি নির্ধারকদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। এটি বাজারে ভেজাল খাদ্য প্রতিরোধের ক্ষেত্রে কার্যকরী দিকনির্দেশনা প্রদান করে। প্রবন্ধে উপস্থাপিত গবেষণার ফলাফল এবং সুপারিশগুলো সমাজে সচেতনতা বৃদ্ধি করতে এবং খাদ্য সুরক্ষা নিশ্চিত করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে বলে আশা করা যায়।
একটি পূর্ণাঙ্গ জীবন ব্যবস্থা হিসেবে ইসলাম মানবজীবনের প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রগুলোতে দিক-নির্দেশনা প্রদান করেছে। এ সব দিক-নির্দেশনার ওপর ভিত্তি করে বিশেষজ্ঞ আলেমগণ বিভিন্ন তত্ত্ব ও পরিভাষা উদ্ভাবন করে ইসলামী জ্ঞানগত ঐতিহ্যকে সমৃদ্ধ করেছেন। এর মধ্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিভাষা হলো ‘আহলুল হাল্ল ওয়াল আকদ’, যা গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে জ্ঞানী এবং কর্তৃত্বশীল ব্যক্তিদের ভূমিকা নির্দেশ করে। এই পরিভাষাটি ইসলামী শাসন ও বিচারব্যবস্থায় এক বিশেষ স্থান অধিকার করেছে। “বিশেষজ্ঞ আলেমদের দৃষ্টিতে ‘আহলুল হাল্ল ওয়াল আকদ’: প্রাক-আধুনিক ও আধুনিক সময়ের আলোকে একটি বিশ্লেষণ” শীর্ষক প্রবন্ধে ইসলামী দৃষ্টিকোণ থেকে গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে ‘আহলুল হাল্ল ওয়াল আকদ’ পরিভাষার গুরুত্ব এবং সময়ের বিবর্তনে এর চিন্তাগত ভিন্নতা আলোচিত হয়েছে। প্রবন্ধটি বিশেষভাবে এই চিন্তাগত পার্থক্য এবং তার পেছনের ইতিহাস ও কারণগুলো বিশ্লেষণ করেছে, যেগুলোর মধ্যে এক ধরনের সাংস্কৃতিক ও ধর্মীয় বাস্তবতা রয়েছে। সময়ের সঙ্গে মুসলিম সমাজে যেসব সামাজিক ও রাজনৈতিক পরিবর্তন এসেছে, তা এই পরিভাষার ব্যাখ্যায় প্রভাব ফেলেছে। উক্ত পরিবর্তনগুলো কীভাবে মুসলিম সমাজের জ্ঞানী ব্যক্তিদের সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়াকে প্রভাবিত করেছে এবং নতুন চ্যালেঞ্জ সৃষ্টি করেছে, তা আলোচিত হয়েছে। পাঠক এই প্রবন্ধের মাধ্যমে অনুধাবন করতে পারবেন যে, উক্ত চিন্তাগত পার্থক্যসমূহ সমন্বিত করা একটি জটিল কাজ, যেখানে ধর্মীয় ঐতিহ্য, সামাজিক বাস্তবতা এবং আধুনিক চিন্তা একে অপরকে প্রভাবিত করে।
“বায়ুদূষণ প্রতিরোধে ইসলামের পদক্ষেপ: বাংলাদেশের আইনের পরিপ্রেক্ষিতে একটি পর্যালোচনা” শীর্ষক প্রবন্ধে বায়ুদূষণের বিষয়টি ইসলামী দৃষ্টিকোণ থেকে বিশ্লেষণ করা হয়েছে যেখানে বাংলাদেশের পরিবেশগত চ্যালেঞ্জ এবং বায়ুদূষণ প্রতিরোধে ইসলামের নির্দেশনা গুরুত্ব পেয়েছে। বর্তমান সময়ে পরিবেশ দূষণ, বিশেষ করে বায়ুদূষণ, একটি বৈশ্বিক সমস্যা হিসেবে সামনে এসেছে এবং এটি মানবজাতির জন্য হুমকির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। শিল্পায়ন ও প্রযুক্তির উন্নতির পাশাপাশি বায়ুদূষণ একটি অপরিহার্য দুষ্প্রতিক্রিয়া হয়ে দেখা দিয়েছে, যা মানুষের স্বাস্থ্য ও জীবনের ওপর মারাত্মক প্রভাব ফেলছে। উন্নয়নশীল দেশ হিসেবে বাংলাদেশে বায়ুদূষণের প্রভাব অধিক অনুভূত হচ্ছে এবং এর ফলে অনেক ধরনের রোগ এবং মৃত্যুর ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে। প্রবন্ধে এই সমস্যা সমাধানে বাংলাদেশের বর্তমান আইনী বিধি নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে। প্রবন্ধে বায়ুদূষণের চিত্র বিশ্লেষণ করা হয়েছে এবং কীভাবে ইসলামী নীতিমালা বায়ুদূষণ রোধে সহায়ক হতে পারে তা আলোচনা করা হয়েছে। এই প্রবন্ধে বলা হয়েছে যে, পরিবেশ রক্ষার ক্ষেত্রে শুধু সরকারী আইনই যথেষ্ট নয়; এক্ষেত্রে ইসলামী নীতিগুলোর অনুসরণ এবং মানুষের মধ্যে সচেতনতা বৃদ্ধির মাধ্যমে দূষণের মাত্রা নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব। ইসলামের প্রতি মানুষের বিশ্বাস এবং ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ থেকে যে শিক্ষা পাওয়া যায়, তা পরিবেশগত সমস্যা সমাধানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে এবং বাংলাদেশে বায়ুদূষণকে সহনীয় পর্যায়ে নামিয়ে আনার জন্য কার্যকরী পদক্ষেপ গ্রহণে সাহায্য করতে পারে।
বিগত স্বৈরাচারি শাসনামলে বাংলাদেশে জাতীয় শিক্ষাক্রম ২০২১ এর অধীনে প্রণীত পাঠ্যপুস্তক নিয়ে ব্যাপক বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছিল। পাঠ্যপুস্তকগুলোতে ইসলামী সংস্কৃতি এবং মূল্যবোধের বিকৃত উপস্থাপন, মাদরাসা শিক্ষার্থীদের তবলা এবং নাচগান শেখানো, মুসলিম মনীষীদের জীবনী এবং কবিতা বাদ দেওয়া এবং শিশুদের শারীরিক পরিবর্তন সম্পর্কিত অপ্রয়োজনীয় বিষয় অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছিল। “জাতীয় শিক্ষাক্রম ২০১২ ও ২০২১ এ মাধ্যমিক স্তরের পাঠ্যপুস্তক ও পরীক্ষা পদ্ধতি: একটি পর্যালোচনা” শীর্ষক প্রবন্ধে এ ধরনের বিতর্কিত বিষয় চিহ্নিত করে এসব বিষয় কিভাবে ইসলামের সঙ্গে সাংঘর্ষিক হয়েছে, তা বিশ্লেষণ ও পর্যালোচনা করে সুপারিশ উপস্থাপন করা হয়েছে। এতে পাঠকদের বিতর্কিত বিষয়গুলো সম্পর্কে অবহিত হওয়ার এবং গবেষকদের সুপারিশের আলোকে শিক্ষাক্রম বিন্যাসের সুযোগ তৈরি হবে।
দরিদ্রতা নিরসনে ইসলামী অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনার একটি গুরুত্বপূর্ণ বিধান হলো যাকাত। বিশ্বব্যাপী দরিদ্রতা হ্রাসের জন্য বিভিন্ন কৌশল গ্রহণ করা হলেও, বাস্তবে দরিদ্রতার পরিমাণ ক্রমাগত বৃদ্ধি পাচ্ছে। এমন পরিস্থিতিতে, ইসলামের বিধান অনুসারে যাকাত প্রদানের মাধ্যমে দরিদ্রতা হ্রাসের সম্ভাবনা খুবই উজ্জ্বল। “দরিদ্রতা হ্রাসে ‘সেন্টার ফর যাকাত ম্যানেজমেন্ট’ এর কার্যক্রম: একটি পর্যালোচনা” শীর্ষক প্রবন্ধে যাকাত আদায় এবং এর বণ্টন ব্যবস্থাপনায় সঠিক পদ্ধতি অনুসরণের গুরুত্ব তুলে ধরে ‘সেন্টার ফর যাকাত ম্যানেজমেন্ট’ এর কার্যক্রমকে একটি মডেল হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে। গবেষণায় দেখা গেছে, সরকারি, বে-সরকারি প্রতিষ্ঠান এবং ব্যক্তিগত উদ্যোগের মাধ্যমে যাকাতের সঠিক ব্যবস্থাপনা করলে সমাজে অর্থনৈতিক ভারসাম্য প্রতিষ্ঠা সম্ভব, যা দরিদ্রতা হ্রাসে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। প্রবন্ধে দেখানো হয়েছে যে, যাকাত কেবল একটি ধর্মীয় দায়িত্ব নয়, বরং এটি এমন এক সামাজিক ও অর্থনৈতিক ব্যবস্থা, যা সমাজে ধনী-গরীবের ব্যবধান কমানোর পাশাপাশি প্রান্তিক জনগণের অর্থনৈতিক স্বাবলম্বিতা নিশ্চিত করতে সহায়ক। এই প্রবন্ধের মাধ্যমে সরকার এবং অন্যান্য প্রতিষ্ঠানকে এসডিজি লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে যাকাত ব্যবস্থাপনার গুরুত্ব ও প্রভাব সম্পর্কে আরও সচেতন হওয়ার সুযোগ সৃষ্টি হয়।
ইসলামী আইন ও বিচার জার্নালের ৭৯ ও ৮০ তম যৌথ সংখ্যায় প্রকাশিত প্রতিটি প্রবন্ধ গুরুত্বপূর্ণ যা আধুিনক সময়ের ইসলামী চিন্তাধারা এবং সমসাময়িক প্রসঙ্গগুলো সঠিকভাবে তুলে ধরতে সক্ষম হয়েছে। এই প্রবন্ধগুলো আধুনিক ইসলামী চিন্তাধারার বিভিন্ন দিক উন্মোচন করেছে এবং এটি পাঠকদের জন্য একটি মূল্যবান উৎস হিসেবে কাজ করবে। আশা করা যায়, প্রবন্ধগুলো থেকে পাঠকগণ সমৃদ্ধ হবেন এবং বর্তমান সংখ্যাটি বরাবরের মতোই পাঠকদের মুগ্ধ করবে।
মহান আল্লাহ এ প্রচেষ্টাকে কবুল করুন।
- প্রধান সম্পাদক
Downloads
Published
Issue
Section
License
Copyright (c) 2025 Abu Bakr Rafique Ahmad

This work is licensed under a Creative Commons Attribution 4.0 International License.