সম্পাদকীয়|Editorial
DOI:
https://doi.org/10.58666/iab.v22i85.360Abstract
[সম্পাদকীয়]
আলহামদুলিল্লাহ। আল্লাহর মেহেরবাণীতে ইসলামী আইন ও বিচার জার্নালের ৮৫তম সংখ্যা প্রকাশিত হলো। এবারের সংখ্যায় সমসাময়িক বিভিন্ন বিষয়ে চারটি প্রবন্ধ প্রকাশিত হয়েছে।
“বাংলাদেশের বিদ্যমান আইনের ইসলামিকরণ: সমস্যা ও উত্তরণের উপায়” শীর্ষক প্রবন্ধে যে বিশ্লেষণ উপস্থাপিত হয়েছে, বাংলাদেশ একটি মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ রাষ্ট্র হলেও আজও ঔপনিবেশিক আমলে রচিত পাশ্চাত্য ধাঁচের আইন বিদ্যমান। প্রচলিত আইনব্যবস্থার বিদ্যমান ত্রুটির প্রেক্ষিতে মানুষ ইসলামী শরিয়াভিত্তিক ন্যায়বিচার ও সামাজিক সুবিচারের ধারণার ভিত্তিতে আইন রচনা সম্পর্কে ভাবতে শুরু করে। এরই ধারাবাহিকতায় বিভিন্ন গবেষক, প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশে বিদ্যমান আইন ইসলামিকরণ, এর সম্ভাব্যতা ও উপায় নিয়ে গবেষণা করলেও একটি সুনির্দিষ্ট মডেল উপস্থাপনের প্রয়োজনীয়তা অপূরণীয় থেকে যায়। গবেষক এ প্রবন্ধে বাংলাদেশে বিদ্যমান আইনসমূহের ঐতিহাসিক ভিত্তি ও প্রায়োগিক অবস্থান বিবেচনা করে সমস্যা চিিহ্নত করে সমাধানের উপায় নির্দেশ করেছেন। এক্ষেত্রে তিনি বিশ্বের বিভিন্ন মুসলিম দেশে আইন ইসলামিকরণের নমুনা পর্যালোচনা করে বাংলাদেশে এ প্রাসঙ্গিকতাও প্রমাণ করেছেন। এখানে স্পষ্ট হয়েছে যে, আইন সংস্কার একটি তাৎক্ষণিক রূপান্তর নয়, বরং পর্যায়ক্রমিক এবং প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতার সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ একটি প্রক্রিয়া। তিনি দেখিয়েছেন যে, প্রথম ধাপে সাংবিধানিক কাঠামো নির্ধারণ ও নীতিগত স্বীকৃতি, দ্বিতীয় ধাপে পারিবারিক ও ব্যক্তিগত আইন সংস্কার, তৃতীয় ধাপে সিভিল আইন সংস্কার, চতুর্থ ধাপে অর্থনৈতিক ও আর্থিক আইন সংস্কার, পঞ্চম ধাপে সীমিত এখতিয়ারসম্পন্ন শরীয়া বিচারিক কাঠামো, ষষ্ঠ ধাপে মানবাধিকার ও বহুত্ববাদী বাস্তবতার সুরক্ষা এবং সপ্তম ও সর্বশেষ ধাপে প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা, প্রশিক্ষণ ও গবেষণার মাধ্যমে এদেশে আইন ইসলামিকরণ সম্ভব এবং তা অনস্বীকার্য।
“মানব মর্যাদা সংরক্ষণে কুরআন-সুন্নাহর নির্দেশিত সামাজিক বিধানসমূহের প্রায়োগিক বিশ্লেষণ” শীর্ষক প্রবন্ধ আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় যে, ইসলামের দৃষ্টিতে মানব মর্যাদা কেবল একটি নৈতিক ধারণা নয়, বরং একটি কার্যকর সামাজিক বাস্তবতা। সামাজিক ন্যায়বিচার, গোপনীয়তা রক্ষা, বৈষম্য নিরসন ও নৈতিক শুদ্ধতার মাধ্যমে একটি মানবিক সমাজ বিনির্মাণের যে রূপরেখা ইসলাম প্রদান করে, তা সমসাময়িক সংকটসমূহ মোকাবেলায় গভীর তাৎপর্য বহন করে। এ প্রবন্ধে ইসলাম প্রদত্ত সামাজিক মর্যাদাসমূহ নৈতিকতা ও আচরণ সংক্রান্ত, সামাজিক ন্যায়বিচার সংক্রান্ত, পারিবারিক জীবন সম্পর্কিত, নারীর অধিকার সংক্রান্ত, সামাজিক সংহতি সুরক্ষা সম্পর্কিত এবং অন্য ধর্মের সাথে সম্পর্কিত বিষয়গুলো আলোচিত হয়েছে। গবেষণার ফলাফল অংশে তাত্ত্বিক ভিত্তি থেকে প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোয় রূপান্তরের মাধ্যমে মানব মর্যাদা প্রতিষ্ঠার রূপরেখা বর্ণিত হয়েছে, এক্ষেত্রে মূল্যবোধ চর্চা, শরীয়াহ ভিত্তিক প্রতিষ্ঠান তৈরি ও আইনি সহায়তা কেন্দ্রের মাধ্যমে মানব মর্যাদার সুরক্ষা, বিভিন্ন কল্যাণমূলক কর্মসূচি গ্রহণ এবং বিদ্যমান আইনী কাঠামোয় ইসলামের বিধানের সমন্বয়করণের গুরুত্ব তুলে ধরা হয়েছে।
“বাংলাদেশে নিরাপদ খাদ্য ব্যবস্থাপনায় প্রচলিত আইন: ফিকহী মূলনীতির আলোকে একটি পর্যালোচনা” শীর্ষক প্রবন্ধে বলা হয়েছে, ইসলামী আইন কেবল ইবাদতকেন্দ্রিক নয়, বরং জনস্বাস্থ্য ও সামাজিক কল্যাণের ক্ষেত্রেও সুসংহত নির্দেশনা প্রদান করে। আধুনিক খাদ্য নিরাপত্তা নীতিমালার সাথে ইসলামী নীতির এই সামঞ্জস্য একটি কার্যকর নীতিগত সমন্বয়ের সম্ভাবনা তুলে ধরে। বাংলাদেশে পাশ্চাত্য ধাঁচের আইনী কাঠামো থাকায় এখানে নিরাপদ খাদ্য ব্যবস্থাপনায় বিভিন্ন আইন প্রণিত হলেও তার বাস্তবায়নে নৈতিকতা ও মানবিকতার স্থলে অর্থোপার্জন, শাস্তির ভয় ইত্যাদিই প্রাধান্য পাচ্ছে। ইসলাম খাদ্যদ্রব্যের বিশুদ্ধতা ও পরিশুদ্ধতা বজায় রাখাকে অবশ্য পালনীয় এবং ইসলামি মূল্যবোধের অন্যতম মানদ- হিসেবে চিিহ্নত করে। গবেষণায় বাংলাদেশের বিদ্যমান নিরাপদ খাদ্য ব্যবস্থাপনা সম্পর্কিত আইনসমূহের পর্যালোচনায় অনেকক্ষেত্রে ইসলামি আইনের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ হিসেবে প্রতিয়মান হয়েছে, তবে বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে দুর্বলতা এবং নৈতিক ও মানবিক মূল্যবোধ সম্পর্কিত ধারণার অনুপস্থিতির প্রাবল্য রয়েছে। তাই গবেষক নিরাপদ খাদ্য ব্যবস্থাপনায় নিজে ক্ষতিগ্রস্ত হয়ো না, অপরকেও ক্ষতিগ্রস্ত করো না, কল্যাণ সাধনের চেয়ে অকল্যাণ প্রতিরোধ প্রাধান্যপ্রাপ্ত, বাজার তদারকিতে আল হিসবাহ নীতির প্রয়োগ এবং মাকাসিদুশ শরিয়াহ প্রয়োগের মাধ্যমে আইনী প্রয়োগ ও অনুশীলনে নৈতিক মূল্যবোধের আলোকে জনসচেতনতা বৃদ্ধির উপর গুরুত্বরোপ করেছেন।
“ইসলামের বিবাহনীতি ও নারী বিষয়ক সংস্কার কমিশনের প্রস্তাবনা: একটি পর্যালোচনা” শীর্ষক প্রবন্ধটি ইসলামের বিবাহনীতি এবং নারী বিষয়ক সংস্কার কমিশনের প্রস্তাবসমূহের তুলনামূলক বিশ্লেষণের মাধ্যমে জরুরি বিতর্ককে সামনে নিয়ে এসেছে। জুলাই বিপ্লব, ২০২৪ পরবর্তী রাষ্ট্রের প্রয়োজনীয় সংস্কারের অংশহিসেবে গঠিত কমিশনগুলোর মধ্যে অন্যতম ছিলো ‘নারী বিষয়ক সংস্কার কমিশন’। এখানে প্রতীয়মান হয় যে, সমকালীন মানবাধিকারচিন্তা ও শরিয়ত-নির্দেশিত সামাজিক কাঠামোর মধ্যে তুলনামূলক পর্যালোচনার প্রয়োজনীয়তা অনস্বীকার্য। এ প্রবন্ধের শুরুর অংশে ইসলামের বিবাহনীতির গুরুত্ব ও এর চিরন্তন আবেদন তুলে ধরা হয়েছে। গবেষক দেখিয়েছেন যে, পুতপবিত্র বিবাহনীতিহীন বিভিন্ন সভ্যতার পতন হয়েছে। এ প্রবন্ধে মূল অংশ হিসেবে নারী বিষয়ক সংস্কার কমিশনের প্রস্তাবনায় পারিবারিক আইন, বিয়ে ও তালাক, বাল্যবিবাহ প্রতিরোধ ও উত্তরাধিকার সম্পত্তি বন্টনসহ বিভিন্ন সুপারিশমালা ইসলামি নির্দেশনার আলোকে পর্যালোচনা করে এর সাথে ইসলামি নির্দেশনার সাদৃশ্য ও বৈসাদৃশ্য আলোচনা করা হয়েছে। বিশেষ করে নারী বিষয়ক সংষ্কার কমিশনের রিপোর্টে ‘সমতা’ ও ‘স্বাধীনতা’র নামে থাকা ধারণার অপপ্রয়োগ ও সামাজিক শৃঙ্খলা পরিপন্থি দিকসমূহ উপস্থাপিত হয়েছে।
এ সংখ্যায় প্রকাশিত প্রবন্ধসমূহে আলোচিত হয়েছে যে, ইসলামী আইন ও নৈতিকতা কেবল অতীতের ঐতিহ্য নয়; বরং বর্তমান ও ভবিষ্যতের জন্য একটি জীবন্ত, গতিশীল ও কল্যাজনক জ্ঞানব্যবস্থা। তবে এই জ্ঞানকে কার্যকর বাস্তবতায় রূপ দিতে হলে প্রয়োজন গভীর গবেষণা, প্রজ্ঞাপূর্ণ ব্যাখ্যা এবং সময়োপযোগী প্রয়োগকৌশল।
এই জার্নালের লক্ষ্য কেবল তাত্ত্বিক আলোচনায় সীমাবদ্ধ থাকা নয়; বরং একটি ন্যায়ভিত্তিক, মানবিক ও ভারসাম্যপূর্ণ সমাজ গঠনের বৌদ্ধিক ভিত্তি নির্মাণে অবদান রাখা। আলোচ্য প্রবন্ধসমূহ সেই লক্ষ্যের দিকনির্দেশক হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।
Downloads
Published
Issue
Section
License
Copyright (c) 2026 Abu Bakr Rafique Ahmad

This work is licensed under a Creative Commons Attribution 4.0 International License.



