সম্পাদকীয়|Editorial
DOI:
https://doi.org/10.58666/iab.v22i87.380Abstract
[সম্পাদকীয়]
আলহামদুলিল্লাহ। আল্লাহর মেহেরবাণীতে ইসলামী আইন ও বিচার জার্নালের ৮৭তম সংখ্যা প্রকাশিত হলো। এবারের সংখ্যায় সমসাময়িক বিভিন্ন বিষয়ে পাঁচটি প্রবন্ধ প্রকাশিত হয়েছে।
বর্তমানে অবৈধ উপার্জনের একটি অঘোষিত প্রতিযোগিতা শুরু হয়ে গেছে। অবস্থা দৃষ্টে মনে হচ্ছে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিবর্গ অবৈধ সম্পদ অর্জন ও ভোগ যে অবৈধ, তা অনুধাবন করতেই অপারগ। আবার কেউ কেউ অবৈধ উপার্জন করে কৃতিত্ব জাহির করে। এর প্রেক্ষিতে “অবৈধ সম্পদ অর্জন ও ভোগের নিষেধাজ্ঞা: সূরা আল-বাকারা (২:১৮৮) এবং এসডিজি-১৬ এর একটি তুলনামূলক বিশ্লেষণ” প্রবন্ধটি রচিত হয়েছে। গবেষক বর্ণনামূলক, বিশ্লেষণধর্মী ও তুলনামূলক পদ্ধতি অনুসরণ করে অবৈধ সম্পদ অর্জন ও ভোগের নিষেধাজ্ঞায় সূরা বাকারার ১২৮ নম্বর আয়াতে বর্ণিত মূলনীতিগুলো বিশ্লেষণ করে সেগুলোর সাথে এসডিজি-১৬ এর প্রাসঙ্গিক লক্ষ্যমাত্রা সমূহের তুলনামূলক পর্যালোচনা উপস্থাপনের চেষ্টা করেছেন। অবৈধ সম্পদ অর্জন ও ভোগ প্রতিরোধ, দুর্নীতি ও ঘুষ নিরসন, অর্থনৈতিক ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা এবং সুশাসন নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে সূরা বাকারার ১৮৮ নং আয়াত ও এসডিজি-১৬ এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য সাদৃশ্য বিদ্যমান থাকলেও এ দুটির লক্ষ্য-উদ্দেশ্যের মাঝে বৈসাদৃশ্য পরিলক্ষিত হয়। সূরা আল-বাকারার ১৮৮ নং আয়াত আইনগত কাঠামোর পাশাপাশি নৈতিকতাকেও প্রাধান্য দেয়, যেখানে এসডিজি-১৬-এর প্রাসঙ্গিক লক্ষ্যমাত্রাগুলো প্রাতিষ্ঠানিক ও নীতিগত কাঠামো সংস্কারের গুরুত্বারোপ করে। এ প্রবন্ধ পাঠে পাঠক অবৈধ উপার্জন ও ভোগের নিষেধাজ্ঞা সংক্রান্ত আল কুরআনের নির্দেশনা অবহিত হবার অবকাশ পাবেন।
বর্তমান বিশ্ব ডিজিটাল উপায়-উপকরণ ব্যবহারে অতীতের সকল প্রচেষ্টাকে ছাড়িয়ে গিয়েছে। প্রযুক্তির উৎকর্ষতার সাথে এর অপব্যবহারও দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে। ডিজিটাল মাধ্যমে উপকারী তথ্য প্রচার করা যেমন সহজ হচ্ছে, তেমনি অপতথ্য মহামারির মতো ছড়িয়ে দেয়া হচ্ছে। ফলশ্রুতিতে ব্যক্তিগত সম্মান ও মর্যাদা সুরক্ষার বিষয়টি এখন মারাত্মক হুমকির মুখোমুখি। “ডিজিটাল গোপনীয়তা ও মানহানি সুরক্ষা: সাইবার সুরক্ষা আইন ২০২৬-এর শরয়ী মূল্যায়ন” শীর্ষক প্রবন্ধে ডিজিটাল গোপনীয়তা ও মানহানি সুরক্ষায় বাংলাদেশের বিদ্যমান আইনী কাঠামোয় থাকা ‘সাইবার সুরক্ষা আইন ২০২৬’ এর প্রয়োগযোগ্যতা, গুরুত্ব ও কার্যকারিতা আলোচনা করা হয়েছে। এ প্রবন্ধে ফুটে উঠেছে যে ডিজিটাল যুগে জেনারেটিভ আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স (Generative AI)-এর অভাবনীয় বিকাশের ফলে এর নৈতিক নির্ভরযোগ্যতা ও মানবিক মর্যাদার ক্ষেত্রে এক গভীর সংকট সৃষ্টি হয়েছে। যেমন—এআই সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ব্যক্তিগত মর্যাদা এবং গণতান্ত্রিক চর্চাকে ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করার সুযোগ তৈরি দিয়েছে। গবেষক দেখিয়েছেন, বাংলাদেশে সামাজিক অপপ্রচার এবং অনলাইন প্ল্যাটফর্মগুলোকে কেন্দ্র করে নানা নেতিবাচক বিষয় সামনে আসছে। ‘সাইবার সুরক্ষা আইন ২০২৬’-এ পূর্ববর্তী কার্যকর ব্যবস্থাগুলোর দুর্বলতা সংশোধন করার চেষ্টা করা হয়েছে, তদুপরি এ আইনে এখনো ডিজিটাল গোপনীয়তা ও মানহানি সুরক্ষায় দুর্বল আইনী কাঠামো হিসেবে বিবেচিত। গুণগত ও নীতিগত আইনি গবেষণা পদ্ধতি অনুসরণ করে পরিচালিত এই গবেষণায় দেখানো হয়েছে যে, মানবজীবনের মর্যাদা রক্ষা করার পাশাপাশি প্রযুক্তির সুষ্ঠু ব্যবহার নিশ্চিত করতে মানবিক নীতিমালা, নৈতিকতা ও শরয়ী নির্দেশনার সমন্বয় প্রয়োজন। এক্ষেত্রে কাজফ (قَذْفٌ) এবং তাযীর (تَعْزِيرٌ)-এর বিধান বিদ্যমান আইনে সন্নিবেশি করাও প্রয়োজন। সর্বোপরি, এ গবেষণায় ডিজিটাল গোপনীয়তা ও মানহানি সুরক্ষায় ‘সাইবার সুরক্ষা আইন ২০২৬’-এর প্রয়োগ কৌশল এবং বিদ্যমান আইনের কতিপয় ধারায় সংশোধনের সুপারিশ করা হয়েছে।
সাম্প্রতিক সময়ে একটি অভিযোগ আমাদের সামনে স্পষ্ট হচ্ছে যে বাংলাদেশের ইসলামী ব্যাংক সমূহে যথাযথ শরী‘আহ্ এর বিধান পালিত হচ্ছে না। যদিও শরী‘আহ্ সুপারভাইজরি কমিটি এবং মুরাকিব নিযুক্ত করা রয়েছে এবং তাদেরকে প্রযোজ্য ক্ষেত্রে স্বাধীনতাও প্রদান করা হয়েছে; তথাপি বাস্তবে তাদের কাম্য কার্যক্রম প্রতিফলিত হচ্ছে না বলে প্রতীয়মান হচ্ছে। এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের উপায় নিয়ে রচিত হয়েছে “বাংলাদেশের পূর্ণাঙ্গ ইসলামী ব্যাংকসমূহে শরী‘আহ্ গভর্ন্যান্স: ২০২৩-২০২৫ সালের বার্ষিক শরী‘আহ্ প্রতিবেদনভিত্তিক একটি পর্যালোচনা” শীর্ষক প্রবন্ধ। এ প্রবন্ধে বাংলাদেশের পাঁচটি পূর্ণাঙ্গ ইসলামী ব্যাংকের ২০২৩, ২০২৪ ও ২০২৫ সালের বার্ষিক প্রতিবেদনসমূহ গুণগত পদ্ধতিতে নথি বিশ্লেষণের মাধ্যমে মূল্যায়ন করা হয়েছে; যা ইসলামি ব্যাংকসমূহের শরী‘আহ্ পরিপালনের একটি সামগ্রিক চিত্রের উপর ভিত্তি করে রচিত। এটি শরী‘আহ্ পরিপালনের পূর্ণরূপ উপস্থাপন না করলেও এ ধরনের গবেষণায় একটি পথ উন্মোচনকারী রচনা হিসেবে বিবেচিত। উক্ত গবেষণায় বার্ষিক শরিয়া প্রতিবেদনের তত্ত্বের ভিত্তিতে শরিয়া গভর্নেন্সের মূল্যায়ন করা হয়েছে। গবেষক মনে করেন, শরী‘আহ্ প্রতিবেদনকে আরো বিস্তারিত ও জবাবদিহিতামূলক করা, শরী‘আহ্ সুপারভাইজরি কমিটির স্বাধীনতা ও সক্ষমতা বৃদ্ধি, প্রযুক্তি নির্ভর রিয়েল টাইম শরী‘আহ্ কমপ্লায়েন্স ব্যবস্থা চালু, অভ্যন্তরীণ শরী‘আহ্ লঙ্ঘনের ক্ষেত্রে অভিন্ন শাস্তিমূলক নীতি প্রণয়ন এবং শরী‘আহ্ বিষয়ে জনসচেতনতা বৃদ্ধি করার মাধ্যমে ইসলামি ব্যাংকে অধিকতর শরী‘আহ্ পরিপালন সম্ভব হবে।
মানুষ বিবেকসম্পন্ন হওয়ায় সৃষ্টিকূলের মধ্যে যে শ্রেষ্ঠত্ব অর্জন করেছে, অনেক মানুষের আচরণে তাদেরকে পশুর চেয়েও অদমে পরিণত করেছে। আজ মানুষ যেন বিংশশতাব্দীর নব্য জাহেলিয়াতে ফিরে গিয়েছে। অপরাধের রাজ্যে মানুষ নানাবিদ অপরাধে জড়িয়ে পড়েছে। অপরাধ সংঘটনের পেছনে প্রভাব বিস্তারকারী প্রভাবকসমূহের মধ্যে মাদক অন্যতম। মাদকের সর্বগ্রাসী ক্ষয়-ক্ষতির প্রতিবিধান সম্পর্কে গবেষক রচনা করেছেন “বাংলাদেশে অপরাধ বিস্তারে মাদকের প্রভাব ও এর প্রতিকার : ইসলামী দৃষ্টিকোণ” শীর্ষক প্রবন্ধ। বর্ণনামূলক (উবংপৎরঢ়ঃরাব) এবং বিশ্লেষণাত্মক (Descriptive)গবেষণা পদ্ধতি অনুসরণ করে রচিত এ গবেষণায় লেখক বিভিন্ন মাধ্যমিক উৎস থেকে প্রাপ্ত তথ্য এবং সরাসরি কেইস স্টাডি থেকে প্রাপ্ত প্রাথমিক তথ্যের উপর ভিত্তি করে প্রমাণ করেছেন যে, নানাবিদ অপরাধের পেছনে মূল অনুঘটক হলো মাদক। ফলাফলে প্রতীয়মান হয়েছে যে, প্রচলিত আইন ও ইসলামী আইনের সমন্বিত প্রয়োগ, ধর্মীয় ও নৈতিক মূল্যবোধের জাগরণ এবং জনসচেতনতা বৃদ্ধির মাধ্যমে দেশে ক্রমবর্ধমান মাদকাসক্তি নির্মূলের মাধ্যমে অপরাধ কার্যকরভাবে নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব।
সুস্থ শরীর, সুস্থ চিন্তার সহায়ক, সাবলীল কর্মে প্রেরণাদায়ক; সুস্থ শরীর নির্ভরশীল পরিমিত ও নিরাপদ খাদ্যের উপর। তাই নিরাপদ খাদ্য একজন ব্যক্তি, সমাজ ও রাষ্ট্রের সামগ্রিক উন্নতি-অগ্রগতির উপর প্রভাব বিস্তার করে। বাংলাদেশের মতো মুসলিম প্রধান জনগোষ্ঠীর বাজার ব্যবস্থায় ফরমালিনের ন্যায় মারাত্মক ক্ষতিকর রাসায়নিকের অপব্যবহার আশংকাজনক হারে বাড়ছে। বাংলাদেশ সরকার ফরমালিনের বৈধ ও নিয়ন্ত্রিত ব্যবহার নিশ্চিত করতে ‘ফরমালিন নিয়ন্ত্রণ আইন ২০১৫’ প্রণয়ন করেছে। এ আইনে বিভিন্ন প্রতিরোধমূলক ও শাস্তিমূলক ধারা সন্নিবেশিত হয়েছে। তদুপরি সমাজে ফরমালিনের ব্যবহার অহঃরহ। লেখক “ফরমালিন নিয়ন্ত্রণ আইন ২০১৫ ও ইসলামী নিরাপত্তা: একটি তুলনামূলক বিশ্লেষণ” শীর্ষক প্রবন্ধে দেখিয়েছেন যে, বাংলাদেশের খাদ্য নিরাপত্তার ক্ষেত্রে এ আইন গুরুত্বপূর্ণ হলেও এ আইনের কতিপয় ধারায় ইসলামি নির্দেশনার সাথে বৈসাদৃশ্য রয়েছে। লেখক এই আইনটির সঙ্গে ইসলামী নীতিমালার তুলনামূলক আলোচনা করে অর্থদণ্ড, পুনরাবৃত্ত অপরাধের শাস্তি, সম্পত্তি বাজেয়াপ্তকরণ ও অপরাধীর মৃত্যুর পর দায় আদায়ের ক্ষেত্রে উভয় ব্যবস্থার মধ্যে কিছু পার্থক্য চিিহ্নত করেছেন। সর্বোপরি, ফরমালিন নিয়ন্ত্রণ আইনের বিধাবলি ও ইসলামি নির্দেশনার আলোকে সচেতনতা বৃদ্ধিতে এ গবেষণা একটি কার্যকর পথপ্রদর্শক হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।
পরিশেষে বলা যায়, এ সংখ্যার প্রবন্ধগুলো কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ সামাজিক সমস্যা সমাধানে ইসলামের প্রায়োগিক দিকে ফুটে উঠেছে। অর্থ উপার্জনে নিষিদ্ধ পন্থা পরিহার, ডিজিটাল গোপনীয়তা ও মানহানি সুরক্ষায় তথা সাইবার সুরক্ষা, আর্থিক প্রতিষ্ঠান ইসলামি ব্যাংকে শরী‘আহ্ পরিপালন, অপরাধ দমনে মাদকাসক্তি নির্মূল এবং খাদ্য নিরাপত্তায় ফরমালিনের নিয়ন্ত্রিত ব্যবহারের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে শরী‘আহ্’র দৃষ্টিভঙ্গি ও প্রয়োগযোগ্যতা তুলে ধরার মাধ্যমে এ সংখ্যাটি ইসলামি জ্ঞান-গবেষণায় একটি গুরুত্বপূর্ণ সংযোজন হিসেবে বিবেচিত হবে। গবেষক, শিক্ষার্থী, আইনপ্রণেতা, সমাজকর্মী ও সচেতন পাঠকমহল এ প্রবন্ধসমূহ পাঠের মাধ্যমে যুগসমস্যা সমাধানে ইসলামের কার্যকর দিকনির্দেশনা সম্পর্কে নবতর জ্ঞানের সাথে পরিচিত হতে পারবে।
- প্রধান সম্পাদক
Published
Issue
Section
License
Copyright (c) 2026 Dr. Abu Umar Faruq Ahmad

This work is licensed under a Creative Commons Attribution 4.0 International License.



